গুয়ান্তামো কারাগারে জীবন ও মৃত্যু

ক্লিভ স্টাফোর্ড স্মিথ 

গত রাতে আমার ক্লায়েন্ট আহমেদ রাব্বানির সঙ্গে কথা হয়। গুয়ান্তামো বে কারাগারে এখনও আটক থাকা ৩৯ বন্দির একজন তিনি। মার্কিন সামরিক বাহিনী পরিচালিত কুখ্যাত কারাগারটির প্রায় অর্ধেকের বেশি বন্দির মত কয়েক মাস আগে তাকেও মুক্তি দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় অথচ সে এখনও ছাড়া পায়নি। 

গুয়ান্তামো কারাগারে জীবন ও মৃত্যু
গুয়ান্তামো বে কারাগার। ছবি: আল জাজিরা।

আমি এখনও আশা করি ছুটির মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই আহমেদ পাকিস্তানে নিজ বাড়িতে ফিরে যাবে। কেননা তাঁর মুক্তিতে কোন বাধা নাই। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও তাঁর দেশে ফিরে আসার ব্যাপারে সায় দিয়েছেন। তবুও সময়ক্ষেপণ নানা উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। তাই কিছু জরুরি কথা ও একটি দুঃসংবাদ দেওয়ার জন্য তাকে ডাকতে হল।

পাকিস্তানের করাচির এক হাসপাতালে আহমেদ এর শ্বাশুরি মৃত্যুশয্যায়। ডাক্তারগণ বলছেন তিনি হয়তো চার/পাঁচ দিনের বেশি বাঁচবেন না। অবশ্য তাকে বিমানে করে গুয়ান্তামো থেকে করাচিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এ ক'দিন যথেষ্ঠ সময় - যদি মার্কিন সামরিক বাহিনী যেতে দেয়। তবে তারা যে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেবে, এমন সম্ভাবনা কম। তাই তাকে বলি সম্ভবত সে আর কখনই তার শ্বাশুরিকে দেখতে পাবেনা। 

কথাটি শোনার পর বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আহমেদ বলে, "এখানে থাকাবস্থায় গত ২০ বছরে অনেক নিকটাত্মীয়কে হারিয়েছি।" একটু থেমে আবার বলতে থাকে, "তাদের মধ্যে দুইজন আমার খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাদের মৃত্যুর পর আমি ভেঙ্গে পড়ি। একজন আমাকে তার সন্তানের মতই স্নেহ করতেন। অন্যজন আমার বাবা। এখন শাশুরিও মৃত্যুপথযাত্রী! তিনি মারা গেলে পরিবারটির সবচেয়ে জেষ্ঠ্য ব্যক্তি হিসেবে তাদের দেখভালো করার ছিল আমারই, অথচ আমি এখনও বন্দি।" 

"এটি খুবই খারাপ অবস্থা," আহমেদ বলে। "গত ২০ বছর ধরে আমি আমার স্ত্রী থেকে দূরে। সত্যিকার অর্থে (আমার শ্বাশুরিই) তার শেষ আশ্রয়। আমার কাছে শ্বাশুরি আমার স্ত্রীর মায়ের থেকেও বেশি কিছু। তিনি আমাকে ভালোবাসেন এবং আমিও ভালোবাসি। মাঝে মাঝে মনে হত তিনি নিজের সন্তানদের থেকেও আমাকে বেশি আদর করেন। তাঁর জীবনের শেষ ক'টা দিন পাশে থেকে সেবা করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। দিতাম সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে"

"তিনি মারা যাওয়ার আগে অন্তত তাঁর পায়ে চুমু খেতে চাই," সে বলে।

জবাবে কি বলতে হবে, আমার জানা নাই। মনে হয় তার এ ইচ্ছাটুকুও আমার দেশ পূরণ করবেনা। 

২০১৩ থেকে আহমেদ অনশন করে যাচ্ছে। যদিও কারা কর্তৃপক্ষ জোর করে দিনে দু'বেলা তাকে খাওয়াচ্ছে, তবুও তার ওজন অনেক কমে গেছে, স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছে। পনেরো বছর ধরে আমি তার আইনজীবী হিসেবে কাজ করছি। এ সময়ে সে অনেকবার আত্নহননের চেষ্টা করেছে। সর্বশেষ দুঃসংবাদটি যখন দিচ্ছিলাম, তখনও মনে হচ্ছিল আবারও আত্মহত্যার চেষ্টা চালাতে পারে। 

তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে বলে, "আমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে, খবরটি শোনার পর ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া শুরু করি, স্বাস্থ্যেরও কিছুটা উন্নতি হয়। কিন্তু এখন প্রায়ই বুকে ব্যথা করে, খুব কষ্ট হয়।"

সে বলতে থাকে, "যখন আপনি জানবেন আপনাকে মুক্তির অনুমতি দেওয়া হয়েছে কিন্তু ছাড়া পাচ্ছেন না, তখন দুশ্চিন্তা বাড়ে। বাড়ি যেতে পারবো, খবরটি শোনার আগে এখানে এক এক দিন ১০ দিন মনে হতো। আর এখন এক দিন যেন এক মাসের সমান। আশায় বুক বাঁধি একদিন ঠিকই মুক্তি পাবো। দিন, মাস, বছর যায়, এমন কিছুই হয়না। আমাদের দেশ আমাদের গ্রহণ করতে চায়, আমেরিকা বলেছে যাও, অথচ আমরা এখানেই পড়ে আছি। এদিকে আমার শ্বাশুরি মারা যাচ্ছে। এ আশা-অপেক্ষা যাতনার।" 

ফোনালাপের সময় গুয়ান্তামো কারাগারের ২০তম বার্ষিকী ১১ জানুয়ারী, ২০২২ নিয়েও কথা হয়।

আরও পড়তে পারেন: ইসরায়েলে দূতাবাস খোলার ঘোষণা সিঙ্গাপুরের

আহমেদ বলে, "আমাদের কাছে এ বার্ষিকী যন্ত্রণার। এটা আমার মৃত্যু বার্ষিকী হলে বেশি ভালো হতো। এখনও বেঁচে আছি পরিবারকে দেখতে। নচেৎ বহু আগেই বাড়ি যেতো আমার কফিন। আমার বয়স এখন ৫০ এবং মৃত্যু ও জীবনের মধ্যে বেশি সময় নেই। সম্ভবত তারা (আমেরিকা) লক্ষ করার আগেই আমরা নিজেদের শেষ করে দেবো।"

আহমেদ ভাবে তার মামলাটি যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক খেলা নয়তো। "বাইডেন আমার কাছে কি চায়? কেন সে আমাকে এখানে আটকে রেখেছে? আমার জানা নাই," তিনি বলেন। 

তিনি জানান তাঁর এই দুর্দশা থেকে মুক্তির উপায় একটাই। "একটাই সমাধান আছে, যা আমি করতে পারি। আবারও শান্তিপূর্ণ অনশনে যাবো।"

"শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অনশন করে যেতে চাই, তাতে যদি অন্য কারোর মুক্তি সহজ হয়। খুব শীঘ্রই আমি তা শুরু করবো। এই কলটির পরই নির্জন কারাবাসে চলে যাবো। সবকিছু প্রত্যাখ্যান করবো, যতক্ষণ না আমার মৃত্যু হয়। বাড়ি যাবে আমার কফিন। মারা যাওয়া আমার জন্য কঠিন কিছু নয়," আহমেদ বলে। 

আমার বিশ্বাস প্রায় দুই দশকের ভোগান্তির পর আহমেদ এর জন্য মারা যাওয়া সহজই। কিন্তু বাইডেন প্রশাসনের জন্যও সময়ক্ষেপণ বন্ধ করা ও শেষ বারের মত তার প্রিয় শ্বাশুরিকে দেখতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া কঠিন হবেনা। 

আমার দেশ এই ব্যক্তির জীবন থেকে দুই দশক চুরি করেছে। এখন যা করতে পারে তা হল অন্তত একবারের জন্য তার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা।

এই লেখাটি প্রকাশ হওয়ার কিছু পূর্বে আহমেদ রাব্বানির শ্বাশুরি ইন্তেকাল করে। কিন্তু এই আইনজীবীর সাহস হয়নি খবরটি তাকে জানানোর।

লেখক ক্লিভ স্টাফোর্ড স্মিথ একজন মানবাধিকার আইনজীবী এবং যুক্তরাজ্যে অবস্থিত একটি দাতব্য সংস্থার পরিচালক।

কাতার ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরায় ইংরেজিতে প্রকাশিত লেখাটি দ্য ট্রিবিউন এর পাঠকদের জন্য বঙ্গানুবাদ করা হলো। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url