ভাসানচর ও শরণার্থী 'গুদামজাতকরণ'

হান নুয়েন এবং থাম্বা লুইস 

হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে কক্সবাজার থেকে বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দ্বীপ ভাসানচরে স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরুর পর এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বলছে কক্সবাজারে ঘিঞ্জি ক্যাম্পসমূহে ভিড় কমাতে এই স্থানান্তর অপরিহার্য। তবে এতে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘ মেয়াদি সমাধান ও তাদের মৌলিক অধিকারসমূহ পাওয়ার বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। ভাসানচরকে তুলনা করা যায় শরণার্থী 'গুদামজাতকরণ" ধারণাটির সাথে, যেখানে তাদেরকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখা হয়। 

ভাসানচর ও শরণার্থী 'গুদামজাতকরণ'
ছবি: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা

ভাসানচরে বর্তমানে প্রায় ১৯ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীর বসবাস। ভবিষ্যতে আরও মানুষের স্থানসংকুলানের জন্য দ্বীপটিতে নেই উপযুক্ত অবকাকাঠামো। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের সমূহ সম্ভাবনাতো রয়েছেই। সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে প্রয়োজন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ, যা মৌলিক অধিকারের সম্মান নিশ্চিত করবে, সহযোগিতামূলক পন্থা বাতলে দেবে এবং আশ্রয়দানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় সহায়তা করবে।

কক্সবাজার থেকে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে সাগরে একটি নৌকা আটকে থাকার পর বাংলাদেশ ২০২০ সালের মে মাসে ভাসানচরে রোহিঙ্গা শরণার্থী পাঠানো শুরু করে। প্রথম দিকে বলা হচ্ছিলো কক্সবাজারে ক্যাম্পসমূহে কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধ করতে কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা হিসেবে তাদের সেখানে পাঠানো হচ্ছে।  

২০২০ সালের ডিসেম্বরে এসে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর শুরু করে। জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও অধিকার সংগঠনগুলো তখন ভাসানচর শরণার্থীদের জন্য সুরক্ষিত, নিরাপদ ও বসবাসের যোগ্য কিনা যাচাই করতে একটি স্বাধীন মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়েছিল, কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে স্থানান্তরে রোহিঙ্গাদের সম্মতি ছিল। অথচ মিডিয়া প্রতিবেদন বলছে স্থানান্তরের পূর্বে এ বিষয়ে অনেকে খুব সামান্যই জানতে পেরেছে এবং কেউ কেউ মনে করছে তাদের জোরপূর্বক সেখানে পাঠানো হয়েছে। 

ইউএনএইচসিআর ও অধিকার সংগঠনগুলো বলছে ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে ভাসানচরের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মত পর্যাপ্ত ব্যবস্থা সেখানে নেই। অনেক রোহিঙ্গা বলছে তারা যেন "কারাগারে" বসবাস করছে। সেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্ম ও সুরক্ষা সুবিধা খুবই সীমিত। এর মধ্যেই বাংলাদেশ রিফিউজি কমিশনার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে ১ লাখের কোটা পূরণ করতে সরকার ২০২২ সালের বর্ষা মৌসুম শেষে সেখানে আরও ৮১ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে পাঠাবে।

বিশ্বজুড়ে শরণার্থী গুদামজাতকরণের একটি লম্বা ইতিহাস রয়েছে। এই ব্যবস্থার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফল কিন্তু ভালো নয়। তাদেরকে দীর্ঘ সময় অন্যের উপর নির্ভরশীল ও মৌলিক অধিকার বঞ্চিত রাখার বিষয়টির ধারাবাহিকভাবে সমালোচনা করে আসছে সমালোচকরা। উদাহরণস্বরূপ অস্ট্রেলিয়ার উপকূল অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কথা বলা যায়, যারা দেশটিতে আশ্রয় চাওয়া লোকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার জন্য সমালোচিত হয়ে আসছে।   

বিশ্বের অন্যান্য অভিবাসন কেন্দ্রগুলোর যে চ্যালেঞ্জিং রেকর্ড, তা থেকে ব্যতিক্রম হতে ব্যর্থ হয়েছে ভাসানচরও। বাংলাদেশ ১৯৫১ রিফিউজি কনভেনশন এ স্বাক্ষর করেনি এবং রোহিঙ্গাদেরকে কাজের অধিকার, চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পারিবারিক একতার স্বাধীনতা দেয়নি। তাই ভাসানচরে আবারও স্থানান্তর সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের পথ সংকুচিত করবে। 

২০২১ সালের জুলাইয়ের শুরুর দিকে রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে মিডিয়ায় খবর হয়। সে সময় ৫ হাজারের বেশি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে তিনজন শিশু মারা যায়। বিচ্ছিন্ন জীবন-যাপন, সাহায্য ব্যবস্থা থেকে পৃথক থাকা ও নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে যেতে না পারার কারণে অনেকেই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ সরকার ৬৮ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচর থেকে কক্সবাজারে তাদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি দেয়। 

যদিও ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ২০২১ সালের অক্টোবরে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পর দ্বীপটিতে মানবিক সহযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। তবে তা এই নিশ্চয়তা দিচ্ছেনা যে রোহিঙ্গারা মূল ভূখণ্ডে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে বা ভাসানচরে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত হতে পারবে অথবা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ পাবে। 

বৃহৎ অর্থে অধিকাংশ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে সম্ভবত বাংলাদেশেই থাকতে হবে। কেননা ২০২১ সালের ফেব্রিয়ারিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক দেশটির ক্ষমতা দখলের পর  রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে।  

অনেকগুলো বিকল্প আছে, যা বাংলাদেশ সরকার করতে পারে। দেশটির অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিয়মিতকরণ এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরে চাপ কমাতে তাদের জন্য অন্য কোন উপযুক্ত স্থানে আবাসন সুবিধা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এতে বৈশ্বিক গুদামজাতকরণ চ্যালেঞ্জে (গুদামঘরে যেভাবে মালামালা রাখা হয়ে, যেভাবে শরণার্থীদেরকে গাদাগাদি করে রাখা) বাংলাদেশও অংশীদার হবে। 

নির্যাতন, হয়রানী, ও অন্যান্য সহিংসতার বিচার চাইতে তাদেরকে আইনি সুযোগপ্রদান এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক আইনে তাদের অধিকার নিশ্চিত করা উচিৎ। তাদেরকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে রেখে উৎপাদনশীলতা নষ্ট না করে স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা আবশ্যক।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্কগুলোসহ সরকারসমূহের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে, তার উন্নতি ঘটবেনা।  

হান নুয়েন মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টারের একজন গবেষক। উদীয়মান স্কলার হিসেবে সর্বোত্তম গবেষণা পত্রের জন্য তিনি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ডিসেন্ট ওয়ার্ক পুরষ্কার পান।।

থাম্বা লুইস মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টারের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক। তিনি ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড এবং কাইরোতে আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে শরণার্থী বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।

আর্টিকেলটি প্রথম প্রকাশিত হয় আন্তর্জাতিক অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন দ্য ডিপ্লোম্যাট এ। দ্য ট্রিবিউন এর পাঠকদের জন্য ভাবানুবাদ করা হলো। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url